ব্যানার কেড়ে নেয়ার একটি সাধারণ ছবি কথা বলে নিপীড়নের, রুখে দাঁড়ানোর কথা কি বলে না?

তোমার ঐ হাত যদি হয় নিপীড়নের তবে আমার এই হাত হোক প্রতিরোধের

সামাজিক গণমাধ্যম ফেসবুকে একটি ছবি শেয়ার করা হয়।  প্রতিদিন কত শত শত ছবি তো ফেসবুকে শেয়ার করা হয়।  অনেকে সেলফি তুলেন, কেউ বা কোথাও বেড়াতে যাওয়ার ছবি শেয়ার করেন, কেউ বা শেয়ার করেন বন্ধুদের নিয়ে একসাথে তোলা কোনো ছবি।  অথবা কেউ কোনো আবেদন সৃষ্টিকারী মানবিক মর্মান্তিক কোনো ছবি শেয়ার করেন। এভাবে প্রতিদিন শেয়ার করা হয় শত হাজার ছবি।  সব ছবি হয়তো সবার নজরে পড়ে না। সবাই সব ছবির দিকে নজরও দেয় না।  বৈসাবি(বৈসু-সাংগ্রাই-বিজু) উৎসবের সময় অনেকেই শত শত ছবি শেয়ার করছেন ফেসবুক টাইম লাইনে।  কিন্তু অনেক সময় কোনো কোনো ছবি যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। যেন ছবি কথা বলছে, চিৎকার করছে।  মাইক বা সাউন্ড বক্সে যেমন কথা বললে কথা কয়েকগুণ বড় করে শোনা যায়, তেমনি এই সকল ছবি জীবন্ত হয়ে আর্তচিৎকার করতে থাকে, জানান দিতে থাকে নিজের অস্তিস্তের। কথা বলতে থাকে অনর্গল, প্রতিবাদ করতে থাকে সোচ্চার কন্ঠে।  আজ ঠিক এমনি একটি ছবি কেউ একজন তার টাইমলাইনে শেয়ার করেছেন।  ছবিটি খুবই সাদামাটা, খুবই সিধে ঢিলেঢালা! কিন্তু ছবিটি যেন জীবন্ত! ছবিটি যেন কোনো কথা চিৎকার করে বলতে চাইছে।

ছবিটিতে কয়েকজন রিনাই-রিসা(পিনোন-হাদি) পরিহিত জুম্ম নারীকে দেখা যাচ্ছে।  তারা পার্বত্য চট্টগ্রামেরই কোনো একটি সাধারণ পথের মাঝখান দিয়ে একটি র‌্যালি করছে বলে বোঝা যায়। তবে কোন সংগঠন বা কাদের নেতৃত্বে বা ব্যানারে এই র‌্যালি করা হচ্ছে তা বোঝা যায় না।  কিন্তু, ছবিটিতে আরেকটি বিষয় রয়েছে। এতে রয়েছে আরেকজনের ছবি।  সেই ছবি একজন ব্যক্তির। সেই ব্যক্তি যে অপাহাড়ি এবং সে ব্যক্তি যে রিনাই-রিসা পরিহিত নারীদের এই র‌্যালিটি থামিয়ে দিয়েছে এবং র‌্যালিতে আগত নারীরা যে এই ব্যক্তির মারমুখী অবস্থানে ভীতসন্ত্রস্ত ও হতবাক তা তাদের চোখমুখের দিকে খেয়াল করলেই বোঝা যায়।

ছবিটি খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার তাইন্ডং ইউনিয়নের যামিনী পাড়ার কাছাকাছি কোনো এক স্থানের ছবি বলে আমরা জানতে পেরেছি।  খোঁজ নিয়ে আমরা জেনেছি, আজ(বুধবার) ১২  এপ্রিল, ২০১৭ সকাল ৮.০০টার দিকে উক্ত এলাকার বড়পাড়া নামক ত্রিপুরা জাতিসত্তা অধ্যুষিত এক গ্রাম থেকে প্রায় ৩০০ জন নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান করে র‌্যালি করছিল ।  র‌্যালিটি যামিনী পাড়া ঘুরে ডাক বাংলা এলাকায় অবস্থিত কলেজ মাঠে ‘বৈসাবি উদযাপন কমিটির ঘোষিত কর্মসূচিতে যোগ দিতে আসছিল।  কিন্তু র‌্যালির জনতা ও নারীরা তখনও জানতে পারেনি যে, তাইন্ডং এলাকায় বৈসাবি উদযাপন কমিটিকে র‌্যালি করতে বাধা প্রদান করছে এবং র‌্যালি যাতে করা সম্ভব না হয় তার জন্য সকল শক্তি নিয়োগ করেছে প্রশাসন ও স্থানীয় সেটলার ও আওয়ামীলীগ-যুবলীগ নেতারা।

র‌্যালিটি তৈলাইফাং নামক একটি ছড়ার উপর থাকা ব্রিজের কাছে আসামাত্র ৪০/৫০ জনের সেটলাদের একটি দল তাদের থামায়। এ সময় তারা কলেজ মাঠে র‌্যালি নিয়ে যাওয়া যাবে না বলে শাসায়। এবং সেটলার মধ্য থেকে একজন র‌্যালির ব্যানার কেড়ে নিতে শুরু করে।  বেচারা র‌্যালিতে আসা জনতা! তাইন্ডং এলাকায় এই বছরই প্রথম তারা র‌্যালি করে আনন্দ হৈহুল্লোড় করে তাদের সামাজিক উৎসব বৈসু(বৈসাবি) পালন করতে চেয়েছিল।

ব্যানার কেড়ে নেয়া হলে র‌্যালিটি সেখানেই শেষ করতে হয়।  র‌্যালির সাথে সাথে তাদের আনন্দ হাসি খুশীও যেন শেষ হলো।

এরই মাঝে এন্ড্রয়েড কোনো ফোনের কল্যাণে আমরা একটি ছবি ফেসবুকে পেলাম। এবং জানতে পারলাম কী নিদারুণভাবে নারীদের কাছ থেকে পেশীশক্তি ও ক্ষমতা প্রদর্শন করে কেড়ে নেয়া হচ্ছে একটি ব্যানারকে এবং একইসাথে কেড়ে নেয়া হচ্ছে সাংস্কৃতিক অধিকারকে, কেড়ে নেয়া হচ্ছে মুক্তজুম্ম জীবনাচরণ আনন্দ হুল্লোড়কে।  কেড়ে নেয়া হচ্ছে আমাদের হাজার বছরের স্বকীয়তা নিয়ে চলা জীবনকে।  রূদ্ধ করা হচ্ছে আমাদের স্বাতন্ত্র্যকে।  আমাদেরকে নিজের জায়গাতেই করা হচ্ছে পরবাসী! ক্রমশ, আমরা পিছু হটছি, এটাই যেন আমাদের  চোখে আঙুল দিয়ে কেউ দেখিয়ে দিল।

ঐ একটি হাত কত শক্তিশালী আমরা  চোখের পলকে বুঝতে পারলাম।  কিন্তু তোমার ঐ হাত নিপীড়িনের যদি হয়, তোমার ঐ হাতের আড়ালে যদি থাকে দানবীয় উগ্রতা, তবে আমার এই হাত কি হবে না প্রতিবাদের ও উগ্রতা প্রতিরোধের?

Print Friendly

Post Comment