রাঙামাটির সাজেকে খাদ্য সংকটঃ সাধারণ পর্যালোচনা

[ রাঙামাটির সাজেকে খাদ্য সংকট বিষয়ে মিঠুন চাকমা একটি সাধারণ পর্যালোচনামূলক লেখা ব্লগে ও ফেসবুকে প্রকাশ করেন। লেখাটি প্রাসঙ্গিক বিবেচনা করে আমরা তা সিএইচটি২৪.কম-এ প্রকাশ করলাম। ধন্যবাদ]

পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি জেলার সাজেক। দেশের বৃহত্তম ইউনিয়ন হিসেবে বিবেচিত এই এলাকা পরিচিত দুর্গম এলাকা হিসেবে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে এর পরিচিতি রুইলুই কংলাক পর্যটনস্পটের কারণে। সাজেকের এই পর্যটনস্পটে এখন হাজার হাজার পর্যটক বেড়াতে যান।

তবে এ বছর এই এলাকা গণমাধ্যমে মোটামুটি আলোচনায় এসেছে ‘খাদ্য সংকট‘ সংক্রান্ত খবর প্রকাশের কারণে। বলা হচ্ছে এই এলাকার জনগণ খাদ্য সংকটে আছে। বলা হচ্ছে, গতবছর বা তার আগের বছরও জুম চাষে ভালো ফলন না হওয়ায় উক্ত এলাকার জুমচাষ নির্ভর জনগোষ্ঠী খাদ্য সংকটে পড়েছেন। বলা দরকার মে-জুন-জুলাই(সম্ভবত) এই তিনমাস সময়ে পাহাড়ের জুমচাষ নির্ভর মানুষজন অধিকাংশ সময়েই খাদ্যাভাবে ভুগে থাকে। আগের বছরের জুমচাষের ফসল এই সময় ফুরিয়ে যায় এবং নতুন বছেরের ফসলও তখন ওঠার সময় হয় না। কয়েক বছর আগে যখন যোগাযোগ ব্যবস্থা আরো বেশি ভালো ছিলো না, তখন এই সময়টিকে পুঁজি করে ‘মহাজন শ্রেণী’ জুমচাষীদের মহাজনী ফাঁদে ফেলে চুষে সাবাড় করে দিত। মহাজন শ্রেণি খুব চড়াসুদে সামান্য ঋণ সাহা্য্য দিতো। তবে বিনিময়ে বহুগুণ সুদসহ উশুল করতো। বর্তমান সময়ে এই ‘ফাঁদ’ এখনো আছে। তবে আগের চেয়ে একটু কমে গেছে বলে জানি। সাজেক বা গংগারাম মাজালং ভ্যালিতে আমার কিছুদিন থাকার সুবাদে এই তথ্যটি জানতে চেষ্টা করেছি।

সাজেক ভ্যালিতে আমি যে সময় ছিলাম সে সময় সার্বিক পার্বত্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল না। বিবদমান দুই আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতি হানাহানি লেগে থাকতো। এজন্য ইচ্ছেমত ঘোরাফেরা করা তখন ছিল জানপ্রাণ হারানোর শামিল। সে জন্য ইচ্ছে ও মন থাকা সত্ত্বেও সাজেকের দুর্গম এলাকায় ঘোরাফেরা করার উচ্চাভিলাষ জাগাতে পারিনি। তবে নানাভাবে সাজেকবাসীর সুখদুঃখকে অনুভব করার চেষ্টা ছিল। আমার অনুভবে আমি যা বুঝেছি তা এখানে জানানোর চেষ্টা করবো।

সাজেকবাসী যারা দুর্গম এলাকায় বসবাস করেন তারা সবসময় অবশ্যই সুপেয় পানির সংকটে থাকেন, এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। এছাড়া তারা চিকিৎসা সুবিধা পান না, তাও শতভাগ সঠিক। যা চিকিৎসা সুবিধা তারা পান তাতে অপচিকিৎসা বেশি থাকায় শরীরে যা ব্যাধি থাকার কথা নয়, তাও তাদের শরীরে জমা হয়ে থাকে। অপচিকিৎসার কারণে তারা দুরারোগ্য নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে থাকে। তাই নারীপুরুষ খুবই দুঃখকষ্টেই থাকেন। সেখানে দেখেছি, দুয়েকটি ঔষধের নাম জেনে বা দুয়েকটি অসুখের জন্য ঔষধের নামধাম জেনে যে কেউই ‘ডাক্তারি’ করা শুরু করেন। এদিকে সাধারণভাবে কেউই দৃষ্টি দেয়নি বলে খেয়াল করেছি।

অন্যদিকে নাগরিক সুযোগ সুবিধা তারা পাবেন না, এটাই সত্য! নাগরিক অধিকার বিষয়ে তারা সচেতন হবেন না! তারা যে দেশের ভুলে যাওয়া বা পাদপ্রদীপের আলো থেকে বিস্তর দূরে থাকা নামেই মাত্র নাগরিক!

এবার আসি সাজেকবাসীর জীবিকা নিয়ে। সাজেকের জনগণ একসময় স্বনির্ভর জীবনযাপন করতো। এককথায় গোটা বছর তারা ভাত-তরকারি-কাপড়-পানিসহ সকল সুবিধা পেতো। জুমে যা উৎপাদিত হতো তা-ই দিয়ে তাদের দিন চলে যেত। তাদেরকে বাজারে আসতে হতো লবন, শুঁটকি, সিঁদোল বা কাপড়চোপড় ও অলংকারপাতি কেনার জন্য। যাতায়াত, যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি সুবিধা তারা না পেলেও সুখে-শান্তিতে তারা দিন কাটাতো!

তবে বিগত কয়েক বছরে মানুষজন বেড়ে গেছে। যা প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল তাও লুটপাটের জালে পড়ে সাজেককে সর্বশান্ত করার উপক্রম করেছে। বাঁশ-গাছ-বেত-পশুপাখী-প্রাণী সবকিছু সাবাড় হয়ে যেতে বসেছে। সাজেক একসময় ঘন বন বা জংগলের জন্য বিখ্যাত ছিল। কিন্তু এখন সেই বন আর নেই। যা আছে তা হলো জায়গা জমি বা ভূমি। তাও ভূমিদস্যুদের কবলে যাবে এটাই ভবিতব্য! তারপরেও বাকি যা কিছু সম্পদ আছে তাও লোভীদের জন্য সুখাদ্যই বটে!

সাজেকে মানুষজন বেড়েছে একথা বলছিলাম। মূলত, রাঙামাটির লুঙুদু, মেরুং, খাগড়াছড়ির দিঘীনালা এমনকি মাটিরাঙ্গার তাইন্দং-তবলছড়ির মানুষজন বাধ্য হয়ে সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল। এছাড়া বান্দরবানের আলিক্যদং/লামা-এর এক পরিবারকে আমি দেখেছি, যারা জায়গা হারিয়ে সাজেকে আশ্রয় নিতে এসেছিল। তাদের পুরোনো জায়গাগুলো তারা সেটলারদের কাছ থেকে হারিয়েছিল। নিজেদের বাস্তুভিটা হারিয়ে দুর্গম অঞ্চলে তারা বসতি গড়ে তুলতে বাধ্য হয়েছিল। এভাবে সাজেকের জনমিতিতে পরিবর্তন আসে। বলা যায় সাজেক হলো এখন ‘সাত মিজাল্যা (সাত জায়গার মিশেল দেয়া মানুষজন)’ মানুষদের বসতস্থান!

জনমিতির এই পরিবর্তনের কারণে সাজেকের এক অংশ বলতে গেলে ‘শহর’ হয়ে উঠেছে! দিঘীনালা থেকে সাজেকের রুইলুই যেতে একসময় কমপক্ষে একদিন হাঁটাপথ ছিল। এখন দিনে চারপাঁচ বার তারও বেশিবার আসাযাওয়া করা কোনো ব্যাপারও না! পেশা হিসেবে সাজেকবাসীর এক বিরাট অংশ এখন জুমচাষ করে না। তাদের একটি অংশ এখন ব্যবসা বাণিজ্য করছে। অনেকেই নানা ব্যবসা করছে। কেউবা বাগান করেছে। কেউ শ্রম দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। তারা এখন দিঘীনালা-সাজেক(রুইলুই) সড়ক বা গাড়িপথের পাশে বসত গড়ে তুলেছে। তারা সুপেয় পানি পানের সুবিধা না পেলেও অন্য নাগরিক সুবিধা কিছুটা অন্তত পাচ্ছে। এই শ্রেণির একটি অংশ কোনো কাজ না করে অন্যকে ঠকিয়ে জীবন জীবিকা বা সংসার চালায়।
আর বাকি যারা দুর্গম এলাকায় বসবাস করে তারা এখনো জুমচাষকেই জীবিকার পদ্ধতি হিসেবে বেছে নিয়েছে। জুমচাষ ভালো বা খারাপ তা বলার জন্য আমি এখানে লিখতে বসিনি। তবে এখন জুমচাষের এলাকা কমে গেছে। চাষকৃত জুম জায়গার চাষক্রম ছিল আগে ২০/২৫ বছর। এখন তা ২/৩ বছরে এসে ঠেকেছে। অনেকসময় একই জায়গা প্রতিবছর চাষে লাগাতে হচ্ছে। এবং এতে ব্যবহৃত হচ্ছে রাসায়নিক সার, কীটনাশক। এতে মাটি উর্বরতা হারাচ্ছে, ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। মাটির উপরিস্তর। শুধু জুমচাষ করে এখন জীবন জীবিকা চালানো অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে। জুমে এখন ফসল কম ফলে। উপরন্তু, জুমচাষে আগে খরচ তেমন না হলেও এখন সার কীটনাশক ইত্যাদি খাতে খরচ করার কারণে উপার্জনের তুলনায় ব্যয় বাড়তির দিকে। তাছাড়া বেড়ে গেছে মানুষজন। এখন জুমচাষের জন্য বাড়তি জমি খুঁজতে নেমে বড়মোন বা পাহাড়ের মূল জংগল অংশ পড়েছে হুমকির মুখে। তবে সেই জায়গায় জুমচাষ না করতে উদ্বুদ্ধ করছে পাহাড়ের রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফ ও জেএসএস।
এই অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে সাজেকের ‘খাদ্য সংকট’কে মুল্যায়ণ করা করা প্রয়োজন। জানতে পারছি সাজেকের জনগণ খাদ্য সংকটে আছে এই খবরটি গণমাধ্যমে আসার পরে খাদ্য সাহায্য দিতে অনেকেই এগিয়ে আসছে। তবে বলা দরকার, ‘খাদ্য সাহায্য’ দিয়ে এই ‘সংকট’ মোকাবেলা করলে উক্ত এলাকায় যে ‘আর্থসামাজিক’ ‘আর্থ সাংস্কৃতিক’ অভিঘাত বা জটিলতা সৃষ্টি হবে তার দায়ভার কেউ নেবে না। নিতে চাইবে না। এই ঠোড়া সহায়তায় সৃষ্টি হতে পারে একদল অলস শ্রেনী! সুযোগসন্ধানীরা এই ‘ঠোড়া সহায়তা’ থেকে ভাগ বসাতে চাইবে, তা চোখ বুঁজে বলা যায়। এতে সাজেকবাসীর মধ্যে শ্রমশীলতা কমে যাবে না তাও বা কে বলবে!?
যারা সাজেকবাসীকে সহায়তা করছেন, বা বিভিন্ন সংস্থা প্রতিষ্ঠান থেকে যারা ‘খাদ্যাভাবীদের’ সহায়তা দিচ্ছেন তাদের সম্মান রেখে এই মত ব্যক্ত করতে হচ্ছে। সাজেকবাসীকে বা দুর্গম পার্বত্য এলাকার অন্য অঞ্চলের বাসিন্দাদের নিয়ে ভাবতে গেলে বা তাদের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ আনতে গেলে আরো গভীরভাবে ভাবতে হবে। কয়েকটি দিনের জন্য তাদের খাদ্য সাহায্য না দিয়ে তাদের জীবনমান উন্নত করতে, তাদের জন্য এলাকার উপযোগী টেকসই জীবিকার ব্যবস্থা করে দিতে পারলে তাদের আগামী জীবন আরো সুন্দর হবে আমার বিশ্বাস।

Print Friendly

Post Comment