লংগদুর তিনটিল্যা ও নিকটবর্তী এলাকার সহিংস ঘটনা বিষয়ে প্রাথমিক মন্তব্য: দেবাশীষ ওয়াংঝা

গত ২ জুন ২০১৭ তারিখের লংগদু উপজেলা সদরের কাছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত তিনটিল্যা ও নিকটবর্তী এলাকাতে মিছিলকারী বাঙালিদের অগ্নিসংযোগ ও আক্রমণের ব্যাপারে প্রাথমিকভাবে আমার মন্তব্য জানাচ্ছি।
“প্রাথমিক” কারন আমার কাছে অনেক প্রয়োজনীয় তথ্য এখনও নেই। একজন ছাড়া এলাকার হেডম্যান ও কারবারিদের সাথে এখনও সরাসরি যোগাযোগ হয়নি, যদিও পরোক্ষভাবে অন্যান্য হেডম্যান ও এলাকার মানুষের কিছু আত্মীয়ের মাধ্যমে খবরাখবর পেয়েছি ও পাচ্ছি। এবং তার যথার্থতা যথেষ্টভাবে খুঁতিয়ে দেখেছি।
তাৎক্ষনিক প্রয়োজন
প্রথমত প্রয়োজন হচ্ছে সরকার দ্বারাঃ (ক) পরিষ্কার সিগন্যাল দেয়া যে এলাকাটি এখন নিরাপদ; (খ) গ্রাম ত্যাগকারীদের গ্রামে ফিরিয়ে আনা; (গ) তাদের পুনর্বাসনের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক বরাদ্দ দেয়া।
দ্বিতীয়ত, নাগরিক সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে, তিনটিল্যা-বাসীর পাসে দাঁড়াতে। আর যদি সাজেকের মত এতেও সরকারী পদক্ষেপ দীর্ঘসূত্রিতা-পরিবেষ্টিত ও অ-যথাযথ হয়, তাহলে এর গুরুত্ব আরও অনেক বেশী বহন করে।
(৪ মে ১৯৮৯-এ অনুরূপ একটি আক্রমণে বর্তমানে অগ্নিকাণ্ডে ও আক্রমণের শিকার ইউপি চেয়ারম্যান ও হেডম্যান কুলীন মিত্র চাকমার মা এবং বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী পল্লব চাকমার ভাই, অন্যান্য অনেক সহ, নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন।
যদিও বর্তমানের রাঙামাটির ডেপুটি কমিশনার মঞ্জরুল মানান পূর্বে লংগদুর ইউনেও ছিলেন, তথাপিও না জেনে থাকতে পাড়েন ভেবে আমি তাঁকে টেলিফোনযোগে তিনটিল্যার ঘটনার আলাপের সময় পূর্বেকার ১৯৮৯-এর ঘটনার ভয়াবহ রূপের কথা জানিয়ে দেয়।)
তৃতীয়ত, ঘটনার জন্য নিরেপক্ষ ও যথাযথভাবে ক্ষমতা-প্রাপ্ত সরকার কর্তৃক গঠিত কমিশন কর্তৃক তদন্তের প্রয়োজন। পাশাপাশি নাগরিক সমাজ থেকেও তা হওয়া প্রয়োজন।
দোষীদের বিরুদ্ধে অন্যান্যের মধ্যে বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ১০৭, ১০৮, ১২০এ, ১২০বি, ১৪১, ১৪২, ১৪৩, ১৪৫-১৫৭, ১৫৯ ও ১৬০ ধারার অধীনে মামলা করা যায়।
(হ্যাঁ, আমার ভালোই জানা আছে যে পারবত্যাঞ্চলের পূর্বেকার অনুরুপ সহিংসক ঘটনার বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে সরকারীভাবে নিরপেক্ষ তদন্ত হয়নি, বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার ও মামলা হয়নি, এবং দোষী ব্যক্তি ও সংস্থারা যথাযথ শাস্তি পাননি। তবে সীমিত ক্ষেত্রে কিছুটা নিরপেক্ষতা বজায় রেখে তদন্ত করা হয়েছিল। আর প্রতিবেদনও অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশিত হয়নি এবং প্রায় সব ক্ষেত্রেই কার্যকর করা হয়নি। তথাপিও দীর্ঘ মেয়াদের জন্য হলেও নিরপেক্ষ ও সরকারী পৃষ্টপোষকতায় তদন্তের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।)
প্রসঙ্গত, রাঙামাটিতে কয়েক বছর আগে সংঘটিত অনুরূপ একটি ঘটনার ক্ষেত্রে ডিসি কর্তৃক আহুত সভায় কিছু প্রশ্ন করেছিলাম তৎকালীন পার্বত্য মন্ত্রী-এম্পি, ডিসি, এস্পি, সেনা কর্মকর্তা ও অন্যান্যদের উপস্থিতিতেঃ “দিবালোকে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে একটি বেআইনি বাঙালি মিছিলকারী দল পাহাড়ি মহল্লাই অগ্নিসংযোগ ও আক্রমণ করেও কেন কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি? যেখানে শহরে প্রচুর পরিমাণে পুলিশ, সেনা, আধা-সামরিক ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনকৃত রয়েছে? আক্রমণকারীরা কি প্যারাসুট নিয়ে আকাশে উড়ে গেছে? মামলা করতে কি সরকারের অনুমোদন লাগবে? আমার এই প্রশ্নসমূহের জবাব কেউই দেননি।
চতুর্থত, এরকম ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে না ঘটে তার জন্যে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে যদি সরকার ব্যর্থ হন (এবং বিগত কয়েক বছরের ঘটনাপ্রবাহ তার সম্ভাবনারই সাক্ষী দেয়), তাহলে পারবত্যবাসীদেরকে তাঁদের দেহ ও সম্পত্তি রক্ষার জন্যে আক্রমণ প্রতিহত করতে, এবং প্রতিহত করার জন্য প্রস্তুতি নিতে, হবে। এছাড়া আর কোন অবলম্বন থাকবেনা।
তবে আমি সম্পূর্ণ আইনানুগ self-defence ও অন্যান্য আইনানুগ প্রতিরক্ষামূলক ব্যাবস্থার কথা বলছি। যা বাংলাদেশের দণ্ডবিধি (বিশেষ করে ৯৬-১০৬ ধারাতে বর্ণিত) ও অন্যান্য আইনানুশারে সিদ্ধ।
২২-২৩ সেপ্টেম্বর ২০১২-তে রাঙামাটিতে সংঘটিত অনুরূপ একটি আক্রমণের ক্ষেত্রে লিখতে গিয়ে আমি বলেছিলাম যে এসব ধরনের ঘটনা প্রতিহত করতে রাষ্ট্রযন্ত্রে জড়িতদের সাথে নাগরিক সমাজের অংশিদারিত্তে যৌথ উদ্যোগ সবচেয়ে বেশী কাংখিত। তা হলে সমগ্র দেশের সার্বভৌমত্ব, অঞ্চলের স্বশাসন, ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের স্বকীয়তা ও অধিকার, ইত্যাদি মাথায় রেখে যথাসম্ভব win-win formula অবলম্বন করা যায়।
সরকারের দায়িত্ব
আমি সাম্প্রতিক ঘটনার বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরার সাথে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যোগাযোগ রেখেছি ( উনি চিকনগুনিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎশাধীন রয়েছেন)। লোকমুখে শুনেছি পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী রাঙামাটি এসছেন এবং লংগদু গেছেন বা যাবেন। এতে সাধুবাদ জানাই। ঢাকার এক বিশিষ্ট নাগরিক সমাজের ব্যক্তি আমাকে জানিয়েছেন যে এব্যাপারে প্রধান মন্ত্রীর উপদেষ্টা ডঃ গওহর রিজভি-কে ব্রিফ করা হয়েছে এবং তিনি রাঙামাটির ডিসি ও অন্যান্য জ্যৈষ্ঠ কর্মকর্তার সাথে কথা বলেছেন। তবে কি নির্দেশনা দিয়েছেন তা আমার জানা নেই। এই লেখাতে উল্লিখিত সরকারের করনীয় কি তা নিয়ে আমার মতামত সংক্ষেপে ওই নাগরিক সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তির কাছে তুলে ধরে উপদেষ্টাকে জানাতে অনুরোধ করলাম।
বিগত পাঁচ বছরের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে রাষ্ট্রের ও পারবত্যাঞ্চলের নাগরিকদের, বিশেষ করে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর, দূরত্ব না কমে বরং বেড়েছে। বিশেষ করে সরকারী সংস্থা সমূহের দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারনে। তথাপিও আমি এই ধরনের আঁতাত গড়ার সম্ভাবনা যতই ক্ষীণ হোক না কেন, তা অসম্ভব নয় বলে এখনও মনে করি (হয়তো এক্ষেত্রে অনেকেই আমার সাথে শুধু ভিন্নমত নয়, বরং দ্বিমতও পোষণ করতে পাড়েন। এবং যৌক্তিক কারনে। তবে এটাও মনে রাখা দরকার যে “রাষ্ট্রযন্ত্রে” জড়িত একাধিক সংস্থা ও ব্যক্তি রয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে অনেকেই জাত্যাভিমানি ও পাহাড়ি-বিদ্বেষী হলেও আরও অনেকে তাই নন)।
সেপ্টেম্বর ২০১২ এর রাঙামাটির সহিংশক আক্রমণ থেকে শিক্ষণীয় প্রতিকার ব্যাবস্থা
যারা ইচ্ছক তারা রাঙামাটি শহরে ২২-২৩ সেপ্টেম্বর ২০১২-এর আক্রমণ সংক্রান্ত আমার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১২-এর “Recent Attacks on Indigenous Settlements in Rangamati Town, Chittagong Hill Tracts, Bangladesh: 22-23 September 2012” শীর্ষক status-টি পড়তে পাড়েন।
উক্ত স্ট্যাটাসে আমি অন্যান্যের মধ্যে অনেকটা Disaster Management-এর কায়দায় নাগরিক সমাজ দ্বারা হিংসাত্মক আক্রমণ ঠেকাতে বা এর শিকার হওয়া থেকে রেহায় পাবার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে মতামত রেখেছি, যথাঃ
(ক) প্রত্যেক পরিবারে সম্ভব হলে একাধিক কোম্পানির সিম কার্ড রাখা (বিপদগ্রস্ত মুহূর্তে পারশপরিক যোগাযোগ রাখার জন্যে); ও
(খ) বাড়ীর যথাযথ স্থানে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ (যুব ও নারী নেতৃ সহ), পুলিশ ও গ্রামের অন্যান্য বিশিষ্ট জনের মোবাইল নম্বর স্পষ্টাক্ষরে লিখে রাখা।
এছাড়া, অন্যান্যের মধ্যে নিম্নলিখিত বিষয়েও পদক্ষেপ নেয়া যা, যথাঃ
(গ) যদি গ্রাম ত্যাগ করে অন্য নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হয় এর জন্য প্রস্তুত থাকা। অর্থাৎ দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষদের ন্যায় (জলোচ্ছ্বাস এবং তুফান/সাইক্লোন থেকে রেহায় পেতে যা করে থাকেন), মোবাইল ফোন, ক্যামেরা, টাকা, গয়না, ডিগ্রি সনদ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দলিল, টর্চলাইট, দাও ইত্যাদি এমন স্থানে রাখতে, যাতে তা অনায়াসে স্বল্প সময়ে পরিবারের সদস্যদের ভাগাভাগিতে বহন করা যায়।
লংগদুতে জানমাল, শরীর, বাড়িঘর ইত্যাদির ক্ষয়ক্ষতি কতখানি হয়েছে তা এখনও স্পষ্ট না। এবিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য লংগদুর ও আদরকছরার ইউপি চেয়ারম্যান, হেডম্যান-কারবারিদের ও অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছি। শুবিধামত সময়ে সরেজমিনে ক্ষতি দেখতে ও ক্ষতিগ্রস্তদের অনুভূতি জানতে এলাকায় যাবো।
আপাততখেত্রে যা কিছু খবর পেলাম এতে মনে হছে নির্ঘাতভাবে এক বয়স্ক মহিলার প্রাণহানি ঘটেছে। আদরকছরা ইউপি চেয়ারম্যান মঙ্গল বাবু প্রহৃত হয়েছেন। তিনটিল্যা গ্রামে অবস্থিত হেডম্যান-কারবারি দ্বারা পরিচালিত MPCC (কমুনিটি সেন্টার) সহ একই গ্রামে ও নিকটবর্তী দুটি গ্রামের বহু ঘরবাড়ী ও দোকানপাট সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ভস্মীভূত হয়েছে।
সম্পূর্ণভাবে বা বহুলাংশে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামসমূহের মধ্যে রয়েছে উপজেলা সদর সংলগ্ন (ক) তিনটিল্যা-বরাদাম গ্রাম (যেখানে ইউপি চেয়ারম্যান কুলীন মিত্র ও ইউপি চেয়ারম্যান মধু বাবুর বাড়ী ও MPCC ছিল, এবং যেখানে এক বয়স্ক মহিলা নিহত হয়েছেন), লংগদু-দীঘিনালা সড়কে তার কিছু উত্তরের (খ) বাত্যাপারা গ্রাম, (গ) মানিকজুরছরা গ্রাম, এবং (ঘ) তিনটিল্যা থেকে লংগদু-দীঘিনালা সড়কের ৭-১০ মাইল উত্তরে অবস্থিত সোনেই মৌজার হেডম্যান-পাড়ায় একটি বাড়ী অগ্নি-সংযোগে ধ্বংসপ্রাপ্ত।
তিনটিল্যার সামান্য উত্তরে ও পশ্চিমের (ঙ) লংগদু-বরাদাম পাড়া ও (চ) মহাজনপারা গ্রামের অধিবাসীরা আক্রমণের শিকার হতো যদিনা তাঁরা আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ গ্রহন করতেন। এতে স্থানীয়ভাবে মোতায়েনকৃত সেনাবাহিনী এবং/অথবা পুলিশ বাহিনীর ভূমিকাও মুখ্য ছিল মর্মে শোনা গেছে, তবে তার সত্যতা বা নির্ভরযোগ্যতার ব্যাপারে আমি নিশ্চিত কিছুই বলতে পারবোনা (কেউ বলেন গ্রামবাসীকে রক্ষার ক্ষেত্রে ভূমিকা আর কেউ কেউ বলেন দায়িত্বের বরখেলাপের ক্ষেত্রে ভূমিকা, আর কেউ কেউ বলেন প্রাথমিক আক্রমণের সময় নিষ্ক্রিয়তা ও তার কিছু পরে রক্ষণমূলক ভূমিকা!)।
আমি সার্বিক ঘটনার দায়ভারের ক্ষেত্রে আপাতত কিছু বলতে চাচ্ছি না। তবে পাছে কেউ ভুল বুঝে থাকেন বা ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত-ভাবে আমার বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা দেন, রেকর্ডের জন্য শুধু বলবো যে লংগদুর ঘটনা যেমনি আমি নিন্দা করি, একইভাবে নয়ন (জানামতে যুবলীগের নেতা) -এর হত্যাও একই মাত্রায় নিন্দা করি, এবং দুটোরই নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির দাবী জানাই।
[০৩ জুন, ২০১৭ প্রকাশিত রাজা দেবাশীষ ওয়াংঝা’র ফেসবুক নোট থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশসহ কপি ও পেস্ট করা হলো।]
Print Friendly

Post Comment