লুঙুদুর তুক্কোপুদি চাকমার দুঃখের কথা শোনাই তবে! -মিঠুন চাকমা

মিঠুন চাকমা
তারিখঃ ০৪ জুন, ২০১৭
শোনো বলি এ কথা, আমি গল্প লিখতে বসিনি, লিখতে বসেছি হিল চাদিগাঙের, ছড়া ঝিড়ি নদী নালা বন বাদাড়ের, গেনখুলী ধুধুক হেংগরং বাজি শিঙার কথা!
আহর,অন্দি রাজার দেচ লাআক ন পেদুং, অঘাদে অপধে জেই ন পেদুং।
লুঙুদু যেন সারা পার্বত্য চট্টগ্রামের দুঃখী মানুষের প্রতীক হয়ে উঠতে শুরু করেছে। সেই ১৯৮৯ সালের ৪ মে তারা একবার আক্রমণের শিকার হয়েছিল। ঘরবাড়ি সহায়সম্পত্তি আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে গিয়ে সর্বস্বান্ত হতে হয়েছিল তাদের। তারপর আরো চলে গেছে যুগ ধেয়ে আরো অনেক বছর। ৮৯ সালের সেই দুঃস্বপ্নের স্মৃতি তারা হয়তো ভুলতে বসেছিল। তাই হয়তো তারা আশায় বুক বেঁধে পাকা ঘর দালান বানাতে শুরু করেছিল।
তারা ভুলে গিয়েছিল, এমন এক সময় ছিল পার্বত্যবাসীরা সুন্দর করে ঘর তুলতে, ভালোমতো ঘর তুলতে চিন্তা করতে পারতো না। তারা ভুলে গিয়েছিল পাকা দালান কেন সাধারণ বাঁশের বেড়া দেয়া ঘর তারা একসময় বানানোর চিন্তা করতো না পাছে সেটলার হামলায় সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পে তাদের সহায় সম্পদ আবার পুড়ে যায় এই দুর্ভাবনায়। তাই তারা তুলতে শুরু করেছিল পাকা দালান!
তারপর এলো ০২জুন, ২০১৭ শুক্রবারের এক সকাল! এবং তারপর পুড়ে গেল তাদের বাড়িঘর, সহায় সম্পত্তি। সাধের স্বপ্ন তাদের ধ্বংস হয়ে গেল। তাই মনের দুঃখ নিয়ে বুকের কোণ থেকে একবুক আবেগের দলা উগরে দিয়ে বুদ্ধ কুমার চাকমা চিৎকার না করেই সিধে ও সাদা ভাষায় বলে ওঠেন, আমাদের ত্রাণ লাগবে না, মেলে ফেলেন। কী এক শুন্যতা পেয়ে বসলে ভদ্র এক গেরস্থের কাছ থেকে এই কথা উঠে আসে তা কি কেউ জানবে বা কেউ কি বুঝবে?
বাহাস বাদ রেখে আজ বলবো উত্তর মানিকজুর ছড়া গ্রামের তুক্কোপুদি নামে এক নারীর কথা। তিনি তার গ্রামে বসবাস করছেন সেই ছোটোকাল থেকে। বিয়ের বয়স হবার পরে কয়েকজন সন্তান হবার পরে তিনি হারান তার স্বামীকে। তারপর সংসারের ভার কাঁধে নেন। ছেলে মেয়েদের মানুষ করার চেষ্টা করেন। এখন বয়স হবার পরে নাতি নাতনিদের আদর ভালবাসা দিয়ে পুত্র কন্যাদের ঘরে ঘরে ঘুরেফিরে আদর আপ্যায়ন যা পাবার তা পেয়ে বাকি দিন কাটানোর কথা। কিন্তু ভাগ্যে যখন লেখা থাকে দুর্ভাগ্যের লিখন, তখন কে তারে সুখে রাখে! কর্মের বাঁধন যে যায় না খন্ডন! দুঃখ যেন লিপির লিখন তার কপালে!
সকালে ঘুম থেকে উঠে তুক্কোপুদি ভাত রান্না করার পরে আয়েশ করে তার নাতিনদের সাথে মশকরা খুনসুটি করে সময় কাটাচ্ছিলেন। সময় বেশ কাটছিল বটে! কিন্তু মানিকজুর ছড়া বিলের ওপারে তিনি দেখতে পেলেন ধোঁয়া উড়ছে, আগুন লেগেছে, চলছে চিৎকার। মানুষজনের পালিয়ে আসার স্রোত তিনি দেখতে পেলেন। দূর থেকে তা দেখেই তিনি নিজের ঘরের উঠানে বসে আপন মনে জীবনের কথা হয়তো ভাবছিলেন। এবং চিন্তা করছিলেন, আপন জাতভাইবোনদের ঘরবাড়ি পুড়ে গেল। বাঁচাতে পারলো না কিছুই। পরিচিত আত্মীয় কেউ মারা গেল কি না তা নিয়ে হয়তো তিনি দুশ্চিন্তা করছিলেন। তিনি ভাবতে পারেননি, বিরাট একটি ধান ক্ষেতের মাঠ পেরিয়ে সেটলাররা মানে দুর্বৃত্তরা তাদের গ্রামেও আসবে! হয়তো তিনি তার জন্য এক কাপড়েই প্রাণ নিয়ে ঘর থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন আরো কিছুক্ষণ পর!
তারপর তিনি দেখলেন ৫শত বা ৬শত বা তারও অধিক সেটলার ধেয়ে আসছে তাদের গ্রামের দিকে। গ্রামের সমর্থ জোয়ান মরদ পুরুষরা রণসজ্জ্বা নিয়ে কান্তা বাদল দা কুড়াল বিয়োঙ খন্তা বা হাতে যা পেল তা-ই নিয়ে গ্রাম বাঁচাতে রুখে দাড়ানোর উদযোগ করলো। শুরু হলো চিৎকার চেঁচামেচি। পুরুষ ও নারীরা একযোগে চিৎকার দিলো, উজোও উজোও, বাঙালুনে আদাম ঘিরদন, উজোও উজোও! গ্রামের নারীরা বুদ্ধ ভগবানের নাম নেয়া শুরু করলো। কিন্তু তারপরও তারা তাদের ভবিতব্যকে ছেড়ে দিলো কপালের হাতে! এবং এভাবে গ্রামের শক্ত সমর্থ নারী ও পুরুষরা রুখে দাঁড়ালো আধ থেকে পৌনে একঘন্টার জন্য। তারা কান্তা বাদল দিয়ে ’দুর্বৃত্তদের’বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলো। রুখে দাঁড়াবো না কেন, জুলি ন উধিম কিত্তেই, কবিতা চাকমার এই কবিতাটি তো তারা পড়েনি!
কিন্তু এ কি! দুর্বৃত্তদের সামনে ’চিদিরে ভদরা’ ওরা যেন কারা? দুর্বৃত্তদের হয়তো প্রতিরোধ করা যায়! কিন্তু যাদের হাতে থাকে আইন ও শক্তির লম্বা হাত, তাদের সাথে এই নিরীহ গ্রামবাসীর কীইবা করবে? এযাবৎ বছরের পর বছর তো তারা এই শক্তির পুজো করে এসেছে ঘরে, গ্রামে, ঝাড়ে, হাটে বাজারে বা পথেঘাটে! তারা আইনী হোক বা অপ্রকাশ্য যে কোনো শক্তিই হোক!
তাই তারা, মানে গ্রামের জনগণ মানে জুম্মা খাপ্পোআ সহজ সরল পাহাড়িরা এবার ’রণে ভঙ্গ’ দিয়ে পিছাতে শুরু করলো। ’য পলায়তি স’ জীবতি’ এই মন্ত্রকে ধারণ করে তারা জীবন বাঁচানো ’ফরজ’ দর্শনকে বাস্তবে রূপ দিল। তারা একান্তভাবেই নিজের প্রাণই তাই হাতে নিয়ে যেতে পারল! নিতে পারলো না সহায় ও সম্পত্তি, এমনকি ’উড়ন পিনন’ মানে পরিধানের কাপড় তা-ও তারা সঙ্গে করে নিতে পারলো না। তারা পালাতে লাগলো। শয়ে শয়ে তারা বাঁশঝাড়, ঝোপঝাড়, আসামলুদি বন, গাছবাঁশ বাগান, ঘেরা দেয়া বেড়া ডিঙিয়ে যেতে লাগল দূর পাহাড়ে! এবং তারা পিছনে দেখার সময়ও খুব কম পেল। কিন্তু যে-ই পিছনে তাকিয়ে দেখল, সে-ই দেখল, দূরে,ওই দূরে, যেখানে তাদের চিরচেনা গ্রাম রয়েছে সেখানে উড়ছে লেলিহান শিখা, বাজছে দামামা! ফুটছে বাঁশ। একইসাথে তাদের ’চিদঅ বদু’ মানে বুকের একান্ত ভেতরটা টনটন করতে লাগল। তবু তারা খুশী যে প্রাণটা তো বাঁচলো!
এভাবেই তুক্কোপুদি নিজের গ্রামে থেকে ০২ জুন সকালে পালিয়ে গিয়েছিল। তারপর এক কাপড়ে তার আশ্রয় হলো ভুইওছড়া নামে এক গ্রামের জুনিয়র স্কুলের একটি বারান্দায়। সেখানে সে আজ ৪ জুন অবধি রইল বসে জেগে ঘুমিয়ে বা চিন্তা দুশ্চিন্তা করে। এদিকে তার নাতিনরাও এসেছে তার সাথে। তাদেরকে নিয়ে কাটতে লাগল যাকে বলে উদ্বাস্তু জীবন! কেউ কি বুঝবে তুক্কোপুদির দুঃখের কথা? তার বুকের ভেতরের হুুহু চোখের পানি ছাড়া কান্না ও একরাশ শুন্যতার কথা। চোখের পানি কি সহজে আসেেএই পোড়ার জুম্মমিলা বুড়োমিলার চোখে! কিন্তু তার মন কি তবে কাঁদে না। কেঁদে ওঠেনা কি তার আবেগ! মনে কোণে কি অশ্রু ঝড়ে না তার?!
তুক্কেুপুদি শুধু একা নেই এই স্কুলে। সাথে রয়েছে তিন গ্রামের উদ্বাস্তু আরো অনেকেই।
হামলার দিন০২ জুন রাতটি তারা কাটালো। ০৩ জুন তারা ভয়ে ভয়ে কেউ যেতে চাইল তাদের গ্রামে। কী অবস্থা হয়েছে তাদের বাড়ির তা জানতে তারা সেখানে যেতে চাইল। কিন্তু ’বেলে সেন্টার’ বা ’গুজবীয় ব্রডকাস্টিং করপোরেশন’ থেকে তারা জানতে পারলো, পুলিশ নাকি জানিয়ে দিয়েছে, গ্রামে তিনজনের বেশি ঘোরাফেরা করলে এরেস্ট করা হবে। আচ্ছা জ্বালা বটে! কিন্তু, আইনী শক্তির কথা তো ফেলনা নয়! তাই তারা গ্রামে গেলে তিনজন একসাথে যায়। ভুলেও তারা ৪ জন একত্র হয়ে গ্রামের দিকে পা বাড়ায় না।
তুক্কোপুদির পরিবারে সাকুল্যে রয়েছে ৫ জন। তিনি রয়েছেন, রয়েছে তার এইচএসসি ফাইনাল দেয়া একটি পুত্রধন, সাথে তার কন্যা ও কন্যার জামাই। আর রয়েছে একটি নাতিন। তার পুত্রধন এইচএসসি পরীক্ষা দেবার পরে গ্রামে এসেছে। এসেই পরে গেল অঘটনে। কন্যার জামাই একবার তাদের গ্রামের বাড়ি দেখতে গেলেন। দেখলেন পুড়ে গেছে তাদের ঘর।কিছুই অবশিষ্ট নেই। পুড়ে গেছে ঘরের যাবতীয় সরঞ্জাম। হাড়িপাতিল তো পুড়ে গেছেই! পুড়ে গেছে বালিশ, পাটি, বুরগি, পিনন, খাদি, লুঙ্গি বা গামছা। পুড়ে গেছে খাট পালংক, খাটিয়া আলনা, ছিল ছিল একটি আয়না। তাও নেই! কিছুদিন আগে মাত্র তাদের পরিবার জমি থেকে ধান কেটে কিছু বস্তায় কিছু খোলা জায়গায় রেখে দিয়েছিল। এই ঝুমঝুম বৃষ্টির মাঝেও তুক্কোপুদির কন্যার জামাই দেখতে পেেেলন, ধানগুলো পুড়ে গেছে। কিছু আছে বটে তবে ঝেড়ে মুছে খেলে তিতাই লাগবে। তাদের জমি থেকে তারা এবার দুইশ আড়ি মানে প্রায় ১ হাজার বা তারও বেশি কেজি ধান পেয়েছিল। সব শেষ হয়ে গেছে।
কী আর করা! তিনি ফিরে এলেন ভুইওছড়া জুনিয়র স্কুলের রুমে। সেখানে তিনি খোলা জায়গায় এলিয়ে দিলেন গা। তারপর চিন্তা করা ছেড়ে দিলেন।
এবার বলি তুক্কোপুদি চাকমার আরেক মেয়ের কথা! মেয়ের নাম শিমলিতা চাকমা। তাদের গ্রামেই শিমলিতা মানে তুক্কোপুদি চাকমার কন্যার ঘর। তাদের বাড়িতে রয়েছে ৫ জন। শিমলিতা নিজে, তার তিনটি কন্যা, আর তার শিমলিতার স্বামী। তিনটি কন্যার মধ্যে একটি পড়ে ৮ম শ্রেনীতে। আরো দুইজন আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষা দেবে। তাদের সবার বইপত্র খাতা কাগজ কলম পুড়ে গেছে সাম্প্রদায়িকতার লেলিহান শিখায়।
তারাও তাদের মা তুক্কোপুদিদের সাথে ভুইওছড়া গ্রামের জুনিয়র স্কুলের রুমে এখন আশ্রয় নিয়েছে।
আরো দূরে আদরকছড়া গ্রামে বাস করে তুক্কোপুদি চাকমার আরেক কন্যা। সে জানিয়েছে আগামী বুধবার বামে আদরকছড়া বাজারে হাটবাজার বসবে। সেখান থেকে তিনি তার মা, তার বোন ও বোন জামাই এবং তার বোন ঝি, ভাইয়ের জন্য কাপড় চোপড় কিনে এনে দেবেন। এরই মাঝে তাদের কাটাতে হবে এক কাপড়ে। কী আর করা! ভাগ্যে যা আছে তা-ই হবে! ভগবান বুদ্ধ, বনবান্তে সহায়। তিনি যদি সহায় না হন তবে তাদের অনেককেই কেন তিনটিলা বনবিহারে আশ্রয় নিতে হলো!
তাদের কষ্টের কথা কি সরেজমিনে তোমরা দেখতে যেতে চাও? তবে যাও লুঙুদু উপজেলায়। সেখানে গেলে তোমরা দেখবে। বিস্তীর্ণ এলাকা পুড়ে গেছে। সব শুনশান। পোড়াবাড়ি ও ভিটা তোমরা দেখবে। তারপর দেখবে হাঁস মুরগি গরু ছাগল চড়ছে মাঠে উঠানে। দেখার কেউই নেই!
Print Friendly

Post Comment